সাদিকুর রহমান খান
একটা ফোন কিনে দেওয়া এখন হয়তো হাস্যরসের বিষয়। বাট তখন কি ততটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিলো না?
এখানে টাকা পয়সা মেইন ব্যাপার না। মেইন ব্যাপার ছিলো লজিস্টিক সাপোর্ট। এই সাপোর্টগুলো যে শিবিরের পোলাপাইন দিয়েছিলো, এটা বহু সাংবাদিকও বলেছেন।
জুলকারনাইন সায়ের ভাই ২০২৪ এর পার্সন অব দ্য ইয়ার ঘোষণা করেছিলেন ঢাবি শিবিরের সভাপতি সাদিক কায়েমকে।
নয় দফার মেইন দফাটা, শেখ হাসিনাকে ক্ষমা চাইতে হবে, এই আইডিয়া দিয়েছিলেন এসএম ফরহাদ।
যতদূর জানি, আব্দুল কাদেরের নয়দফা ঘোষণার ভিডিও সংগ্রহ করা আর সার্কুলেট করার পেছনে ছিলেন আরেক শিবির নেতা, সিবগাতুল্লাহ সিবগা।
এই কাজগুলো কোনটাই এখন খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু মনে হচ্ছে না। একটা মিম দেখলাম যে চারজন বসে পেপার লিখতেছে। আর ক্রেডিট নিচ্ছে বাসার মালিক যিনি ওয়াইফাই দিয়েছিলেন।
খুবই হাসির মিম, সন্দেহ নাই।
এখনকার জন্য হাসির, বাট তখন কি পরিস্থিতি আসলেই হাসির মতো ছিলো?
বিপ্লব ব্যর্থ হলে কার কী হতো, সেইটা অন্য আলাপ। শুধু এইটুক জানি, তথ্যে প্রমাণে, সরকারের কাছে নয়দফার ঘোষণা কার নাম্বার থেকে দেওয়া হয়েছিল? সাদিক কায়েমের।
সাদিক জনগণের থেকে নিজের পরিচয় লুকাইছিলেন। বাট নিজের নাম্বার থেকে সব মিডিয়ার কাছে নিউজ পাঠাইতে কি অস্বীকৃতি জানাইছিলেন? না তো। তাইলে বিপ্লব ব্যর্থ হলে সাদিক কায়েমরা খুব নিরাপদে থাকতেন, এইটা বলার কারণ কী?
এই বিপ্লবের মোটা দাগে ৬ টা স্টেকহোল্ডার ছিলো।
নেতৃত্ব দিয়েছে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন।
জেলায় আর তৃণমূলে প্রচুর বিএনপি জামায়াতের লোকজন ছিলো। এরাই সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রটেকশন দিয়েছে।
ঢাকায় সমন্বয়কদের লজিস্টিক সাপোর্ট দিয়েছে শিবির।
প্রাইভেটের পোলাপাইন নজিরবিহীন সাহস নিয়ে বিদ্রোহ করে বসছিলো।
মাদ্রাসার পোলাপাইন, ইমাম, আলেমরা রাস্তায় ছিলো।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার অফিসগুলো এই সময় খুব এক্টিভ রোল প্লে করে। যেহেতু এই আন্দোলনে আমেরিকার একটা সমর্থন ছিলো।
এখানে কেউই আসলে স্বার্থের বাইরে কিছু করে নাই যে খুব মহান বলতে হবে। সবারই নিজ নিজ স্বার্থ ছিলো।
সবচে চিপায় ছিলো অবশ্যই সমন্বয়করা।
বিএনপি জামায়াত এই আন্দোলনে জয়েন করেছে নিজেদের জন্যই। ৫ আগস্টের আগের জাহান্নাম থেকে মুক্তির জন্য রাজনৈতিক কর্মীদের আর কোন উপায় ছিলো না।
শিবিরও তাই। এরাও লজিস্টিক সাপোর্ট দিয়েছে হাসিনা বিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে। কারো উপর দয়া বা মায়া থেকে না।
ইসলামপন্থীরা ছিলো গত ১৫ বছরের নির্যাতনের ভিক্টিম।
আন্তর্জাতিক সংস্থা আর সাংবাদিকদেরও নিজস্ব কিছু স্বার্থ ছিলো এই আন্দোলনে।
স্বার্থের বাইরে একমাত্র প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির পোলাপাইন এই আন্দোলনে ছিলো। আন্দোলন শেষ, ওরা চলে গেছে। বাট সবাই প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির পোলাপাইন না।
স্বাভাবিকভাবেই, শিবির বা ছাত্রদল তাদের নিজেদের ক্রেডিট ছাড়বে না। এইটা রাজনীতির অংশ। কেউই ছাড়ে না। মুক্তিযুদ্ধের অবদান কি আওয়ামীলীগ বিএনপি ছাড়ে?
ইভেন মুক্তিযুদ্ধের সময় দুই গ্লাস পানি খাওয়ানো মানুষটাও বলে যে আমি মুক্তিযুদ্ধের সময় পানি খাইয়েছি।
তখন ওখানে বলতে হয় না যে পানি তো ছিলোই। আপনি না খাওয়াইলে কি খাইতে পারতাম না?
এইটা ছোট মানুষের পরিচয়।
বরং বলতে হয়, যে ধন্যবাদ। আপনার পানি ঐ সময় আমার খুব উপকার করেছে।
এইটুক বললেই কিন্তু দুই জনই খুশি থাকে।
শিবিরের সাপোর্ট নিয়েও সেইম কথাটাই বলা উচিত ছিলো বৈষম্য বিরোধীদের। শিবিরের কেউই দাবি করে নাই যে এই আন্দোলনের মাস্টার মাইন্ড তারা। বরং তারা বারবারই বলতেছে যে লজিস্টিকস তারা দিয়েছে। সেইফ হাউজের ব্যবস্থা তারা করেছে। নাহিদ ভাইয়ের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিলো ধানমন্ডির এক জামায়াত নেতার বাড়িতে। এই স্বীকৃতিটা ওরা চায়। দিয়ে দেন, সমস্যা কী?
লজিস্টিক সাপোর্ট এখন হাসি ঠাট্টা হতেই পারে। বাট তখনকার সিচুয়েশনটা মেলান তো? যখন মানুষ নিজেরর জন্য ওষুধ কিনতে যাইতে ভয় পাইসে, তখন এরাই তো আপনাদের লুকাইয়া থাকার ব্যবস্থা করে দিছে, আপনাদের কানেকশন করাইয়া দিতে ভূমিকা রাখছে, নয় দফা নিজের নাম্বার থেকে মিডিয়াতে পাঠাইসে। আর কেউ তো পাঠায় নাই, এরাই পাঠাইসে। এইটুক স্বীকার করতে এতো সমস্যা হচ্ছে কেন?
এইসব বিভাজনে লাভ আপনাদের হচ্ছেনা। কেন জানেন? কারণ এক মাঘে শীত যাবে না।
এক আন্দোলনে রাজনীতিও শেষ হয় না।
বরং অত্যন্ত কৌশলে আপনাদের ৬ স্টেক হোল্ডারকে আলাদা করা হচ্ছে, যাতে কেউ আর এক হতে না পারেন।
বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়ার প্রিপারেশন নিতেছে।
প্রাইভেটের পোলাপাইন আর মাদ্রাসার পোলাপাইন চিটেড ফিল করে দূরে সরা শুরু করছে।
এখন শিবিরের সাথেও সম্পর্ক শেষ করলেন।
পরের আন্দোলনে আপনাকে কে সাপোর্ট দেবে?
পরের আন্দোলনেও আপনাদের ফোন লাগবে, এখন যতই হাসাহাসি করেন, তখন কেউ আগাবে না। কারণ ওদের মতো আন্ডারগ্রাউন্ড নেটওয়ার্ক আপনাদের নাই। হতে টাইম লাগবে ২০ বছর। এরপর কোন সমন্বয়ক কার বাসায় লুকাবেন?
এখন সহজ মনে হচ্ছে কারণ রাষ্ট্রের সবকিছুই আপনাদের কবজায়। আর কদিন পর থাকবে না। এখন যেই পুলিশ আপনাদের স্যার বলছে, সেই পুলিশ আর দুদিন পর আপনারে মা*** বলে ধরতে আসবে।
তখন আপনাদের এলাই কারা হবে?
কম করে উড়েন। মুজিবও ঠিক এই কাজ করছিলো। যুদ্ধে দেশ পাওয়ার পর কারো অভিমান এড্রেস করে নাই, সবাইকে দূরে ঠেলে দিয়েছিলো। ফলাফল? ১৫ আগস্ট হবে, সবাই জানতো। কেউ আগায় নাই।
নিজেদের ঐ পরিস্থিতিতে ফেইলেন না।
ফেসবুকের রোমান্টিসিজম আর মাঠের রাজনীতি এক না।
এলাই বানান যত পারেন, দূরে ঠেইলেন না। ওতে নিজেদের হিরোইজমে কম পড়লেও, অন্তত বিপদের সময় মাথায় ছাতা ধরার লোকজন অন্তত পাবেন।